বুধবার,২৭ জানুয়ারী ২০২১
হোম / ফিচার / যার দু’হাত আজ স্বপ্নে ছড়ানো দুটি পাখা
০৮/৩১/২০১৯

যার দু’হাত আজ স্বপ্নে ছড়ানো দুটি পাখা

ভিনদেশি ড. মালভিকা আইয়ার

- মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন তামী

২০০২ সালের ২৬ মে, রাজস্থানের ঐতিহাসিক শহর বিকানির। ১৩ বছরের মালভিকার স্বপ্ন ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়া। সেই স্বপ্নের লক্ষ্যেই সে টুকটুক করে এগিয়ে চলছিল। দর্জি বাড়ি থেকে টুকরা কাপড় নিয়ে এসে নিজেই জামায় কারুকাজ করতেন তিনি। সেদিনও তিনি জামা ডিজাইন করতে গিয়েছিল; কিন্তু ঘটে গেল এক বিপত্তি। জিন্সের প্যান্টটা ছিঁড়ে গিয়েছিল মালভিকার। ছেঁড়া প্যান্টে আঠা লাগাতে বসে তার মনে হলো, আঠা বসানোর জন্য অনেকক্ষণ প্যান্টটা চেপে রাখতে হবে।

কোনোকিছু দিয়ে চেপে রাখলে সময়টা বাঁচবে, এই ভেবে তিনি গ্যারেজে যায় প্যান্ট চাপা দিয়ে রাখার জন্য কিছু আনতে। মালভিকার বাসার পাশে ছিল সামরিক বাহিনীর একটি ক্যাম্প। সেখানকার পরীক্ষামূলক একটি গ্রেনেড তার বাসার গ্যারাজে পড়েছিল। মালভিকা না বুঝেই সেটি নিয়ে যায় প্যান্ট চাপা দিয়ে রাখার জন্য। গ্রেনেডটা প্যান্টের উপর চেপে ধরতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়।

এরপর আঠারো মাস হাসপাতালে কাটাতে হয় তাকে। নানারকম অপারেশন ও ট্রমার মধ্যে দিয়ে গেছে সে এই দেড়টা বছর। অনেক মানুষ তাকে দেখতে এসেছে হাসপাতালে। কেউ কেউ কষ্ট পেয়েছেন তার এমন করুণ অবস্থা দেখে, কেউবা মুখের উপরেই বলে গেছেন, দুই হাত হারানো মেয়েটাকে কে বিয়ে করবে! এখানেই শেষ নয়। সবচেয়ে বড় কথা ডাক্তার বলেছেন, মালভিকার বেঁচে থাকার আশা নেই।

শেষমেশ মালভিকা বেঁচে উঠল। কিন্তু হারালো তার দুই হাত, পা দুটোও হয়ে যায় ক্ষত-বিক্ষত। এছাড়াও অভ্যন্তরীণ ক্ষত হয় অনেক, নার্ভগুলো প্যারালাইজড হয়ে যায়। অনুভূতি শক্তিও হারিয়ে যায়। হাতহীন মালভিকার জীবন হয় আগের চেয়ে একটু ব্যতিক্রম। ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন ক্রমেই ঘুচে যায়। শখের নাচটাও আর চালিয়ে যাওয়া স€¢ব হয় না তার পক্ষে। এরপর শুরু হয় মালভিকা আইয়ারের বড় হতে থাকার দিন।

ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন ও নৃত্যের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বেড়ে ওঠা সেই মালভিকা আইয়ার-এর জন্ম হয় তামিল নাড়ুর কু€^াকোনাম শহরের বি. ক্রিশনান ও হেমা ক্রিশনান দম্পতির ঘরে। বাবার চাকরির সূত্রে তিনি বাবা-মার সাথে ছোটকালেই পাড়ি জমান রাজস্থানের বিকানির শহরে। সেখানেই ঘটে যাওয়া সে দুর্ঘটনাটির পরে তার দিনগুলো কাটতে থাকে চোখে জলে গাল ভিজিয়ে ও মানুষের করুণা দৃষ্টি নিয়ে। মালভিকা এমন জীবন মোটেও চাইতেন না। তাঁর বাবা-মা সব সময়ই তাঁকে একজন আশাবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। ভেঙে পড়তে শেখাননি কখনও। তাইতো মালভিকা এতকিছুর পরও ভেঙে পড়েননি। যেখানে তার ঘুরে দাঁড়ানোর অবল€^ন স্বয়ং মা, তখন ভেঙে পড়ার তো প্রশ্নই উঠে না। হেমা ক্রিশনান ছোট মেয়েকে সবসময় বলতেন, ‘তোমার কোনো না কোনো গুণ আছে অবশ্যই। যেটা তুমি এখন খুঁজে পাচ্ছো না; কিন্তু সঠিক সময় এলে তুমি সেটা খুঁজে নিতে পারবে।’

বিকানিরের কলোনির বাচ্চাদের সাথে ফুটবল খেলা, ঘুড়ি উড়ানো, মায়ের শাড়ি জড়িয়ে শিক্ষক হওয়ার খেলা খেলে বেড়ানো মালভিকার হাস্যোজ্জ্বল জীবনটা এভাবে এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে বসে মা-মেয়ে একসাথে শুধু কাঁদতেনই না, ইন্টারনেটে কৃত্রিম হাতের সন্ধানও করতেন। অবশেষে সন্ধান মেলে জার্মানিতে প্রস্তুতকৃত কৃত্রিম হাতের। লাগানো হয় কৃত্রিম হাত। অত্যন্ত আনন্দ আর স্বাভাবিক জীবনযাপন করার স্বপ্ন নিয়ে বাসায় ফিরে আসেন মালভিকা। কিন্তু নকল হাত কি আর কখনও আসল হাতের জায়গা নিতে পারে?

বোমা বিস্ফোরণের শিকার হয়ে মালভিকাকে এক বছর স্কুল ড্রপ দিতে হয়। সেই সময় ছিল তার এস.এস.এল.সি পরীক্ষা (ঝবপড়হফধৎু ঝপযড়ড়ষ খবধারহম ঈবৎঃরভরপধঃব বীধসরহধঃরড়হ রহ ঈযবহহধর)। সুস্থ হয়ে উঠার পর তিনি সহযোগী লেখক নিয়ে পরীক্ষার্থী হিসেবে এস.এস.এল.সি পরীক্ষা দেন। প্রাইভেট ক্যান্ডিডেটদের এস.এস.এল.সি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়। হাজার হাজার প্রাইভেট ক্যান্ডিডেটের মধ্যে মালভিকা তার রাজ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. এ পি জে আবদুল কালামের সাথে সাক্ষাতের জন্য তাকে রাষ্ট্রপতি ভবনে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই মুহূর্তে তিনি অনুধাবন করেন, “আমার ভেঙে পড়া উচিত না। আমি আর পেছনে ঘুরে তাকাবো না।”

মালভিকা এগিয়ে যেতে থাকেন জীবন যুদ্ধে। দিল্লির সেন্ট স্টিভেনস কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর সমাজকর্মে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির নেওয়ার জন্য ভর্তি হয় দিল্লি স্কুল অব সোশ্যাল ওয়ার্কে (উবষযর ঝপযড়ড়ষ ড়ভ ঝড়পরধষ ডড়ৎশ, উবষযর) ভর্তি হন। এখানেই থেমে থাকেননি মালভিকা। ২০১২ সালে মাদ্রাজ স্কুল অব সোশ্যাল ওয়ার্ক (গধফৎধং ঝপযড়ড়ষ ড়ভ ঝড়পরধষ ডড়ৎশ, ঈযবহহধর) থেকে এম.ফিল ও ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। আর এত পড়াশোনার মাঝেও তার সাথে সাথে চালিয়ে যান তার সামাজিক সচেতনতামূলক কাজগুলো।

বিকানিরের সেই মালভিকা এখন বেশ আলোচিত। ২০১৩ সালে ঞঊউীণড়ঁঃয@ঈযবহহধর থেকে ডাক পান একটি বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। এরপর থেকে তিনি হয়ে উঠেন মোটিভেশনাল স্পিকার। ইতোমধ্যে তিনি আমেরিকা, ইন্দোনেশিয়া, নরওয়ে ও সাউথ আফ্রিকায় বক্তৃতা দিয়েছেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত থেকে শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের কল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন।

জীবন তাঁর কাছ থেকে দুটি হাতই কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু ড. মালভিকা আইয়ারের দুই হাতভর্তি আজ সাফল্য। আর যে জীবন একদিন হারিয়ে যাবার আশঙ্কা ছিল, সে জীবনকেই তিনি দুমড়েমুচড়ে আস্বাদন করে নিচ্ছেন। সব আশঙ্কাকে মিথ্যা করে দিয়ে পার করছেন সন্ধান আর সাফল্যের প্রশান্তিময় জীবন।